তাপদাহে পুড়ছে দেশের দক্ষিন-পশ্চিমাঞ্চল। তীব্র গরমের কারণে উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরায় দ্রুত বাড়ছে শিশু ডায়রিয়া আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। গত ৮ সপ্তাহে জেলার তিনটি হাসপাতালে এক হাজার ৭১৮ জন শিশু ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছে। গত তিন সপ্তাহে শুধু সদর হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ২৫৩ জন ডায়রিয়া আক্রান্ত শিশু। প্রতিদিন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে বাড়ছে শিশু রোগীর ভিড়। শয্যাসংকট আর অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের মধ্যেই চলছে জীবন বাঁচানোর লড়াই।
সাতক্ষীরা সদর, মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও একটি বেসরকারি শিশু হাসপাতালে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ৮ সপ্তাহে মোট এক হাজার ৭১৮ জন শিশু ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এক হাজার জন, সদর হাসপাতালে ৫৭৭ জন এবং বেসরকারি হাসপাতালে ১৪১ জন ভর্তি হয়েছে। এছাড়া প্রতিদিন বহির্বিভাগেও বিপুল সংখ্যক শিশু ডায়রিয়া নিয়ে চিকিৎসা নিচ্ছে।
গত রবিবার সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের ভর্তি করা হচ্ছে। হাসপাতালের শিশু ডায়রিয়া ওয়ার্ডে রোগীর চাপ বেশি। এতে চিকিৎসাসেবা দিতে চিকিৎসক ও নার্সদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। তিল ধারণের জায়গা নেই শিশু ডায়রিয়া ওয়ার্ডগুলোতে। শয্যা না পেয়ে অনেক মা তাঁদের কোলের শিশুকে নিয়ে হাসপাতালের মেঝে কিংবা বারান্দায় আশ্রয় নিয়েছেন।
কলারোয়ার বাটরা গ্রামের আজিজুর রহমান জানান, তার ৭ মাস বয়সি শিশু আনিশা ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হওয়ায় দু’দিন আগে সদর হাসপাতালে ভর্তি করেন। তিনি জানান, শুধু স্যালাইন হাসপাতাল থেকে পাওয়া গেলেও অন্য ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হয়েছে।
তালা উপজেলার তৈলকূপি গ্রামের পলাশ সরদার জানান, ‘তার ৩ বছর বয়সি শিশু ঐশিকে ২দিন আগে হাসপাতালে ভর্তি করেন। তিনি বলেন, ওয়ার্ডের পরিবেশ অস্বাস্থ্যকর ও বেশিরভাগ ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হয়েছে। স্যালাইন ছাড়া হাসপাতাল থেকে তেমন কিছু পাওয়া যায় না।’
শিশু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গরমে শিশুদের শরীরে পানিশূন্যতা দেখা দেয়ায় ডায়রিয়া, জ্বর ও বমির সমস্যা বাড়ছে। তারা শিশুদের মায়ের দুধের পাশাপাশি খাবার স্যালাইন খাওয়ানোর পরামর্শ দিচ্ছেন। একই সঙ্গে পচা ও বাসি খাবার এড়িয়ে চলার কথাও বলা হচ্ছে।
সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিশেষজ্ঞ ও সহকারী অধ্যাপক মোঃ সামছুর রহমান বলেন, দেশে সাধারণত মার্চ ও এপ্রিল থেকে গরম বাড়ে। এ সময়ে শিশুদের শরীরে পানিশূন্যতা দেখা দেয়। এতে ডায়রিয়া ছাড়াও জ্বর ও বমি হয়। তিনি শিশুদের নিয়মিত মায়ের দুধ খাওয়ানো এবং খাবার স্যালাইন দেয়ার পরামর্শ দেন। পাশাপাশি পচা ও বাসি খাবার না খাওয়ানোর বিষয়ে সতর্ক থাকতে বলেন। তিনি আরো জানান, প্রতিদিন গড়ে ২০ থেকে ২৫ জন শিশু ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে।
এদিকে অবকাঠামোগত সংকটের কথা স্বীকার করেছেন সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. আব্দুর রহমান। তিনি জানান, ‘অপর্যাপ্ত শয্যা নিয়ে শিশু রোগীদের সেবা দিতে গিয়ে নার্স ও চিকিৎসকদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। শয্যা বাড়ানোর জন্য সিভিল সার্জনকে জানানো হয়েছে।
সিভিল সার্জন ডা. আব্দুস সালাম বলেন, ‘আমাদের সদর হাসপাতাল মাত্র ১০০ বেডের। এখানে ১৩ বেডের ডায়েরিয়া ওয়ার্ডটি সম্পূর্ণ আলাদা। প্রায় একই সংখ্যাক বেড রয়েছে শিশু সাধারণ ওয়ার্ডে। গরমের সময় শিশু রোগীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেড়ে যায়। এসময় রোগীদের একটু কষ্ট হলেও আমাদের কিছুই করায় নেই। এই মুহুর্ত্বে হাসপাতালে বেড বাড়ানোরও কোন সুযোগ নেই। তবে আমরা ভর্তি রোগদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা দিয়ে যাচ্ছি। বেড সংকটের বিষয়টি উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হবে বলে জানান তিনি।’
প্রকৃতির এই রুদ্ররোষ থেকে শিশুদের বাঁচাতে সচেতনতা আর সঠিক চিকিৎসার পাশাপাশি হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়ানো এখন জরুরি হয়ে পড়েছে সাতক্ষীরার সাধারণ মানুষের জন্য।
খুলনা গেজেট/এনএম

